শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন

সালমানের বাসা ছিল স্কুলের বিপরীতে। সার্কিট হাউজে থাকত ওরা। স্কুল ছুটির পর ওর বাসায় অনেক গিয়েছি অনেক। সেখানে আমরা লুকোচুরি খেলতাম, খাওয়া-দাওয়া করতাম, গল্প করতাম। আমার ফুপি ছিলেন স্কুল টিচার। স্কুল ছুটি হলেও অপেক্ষা করতাম তার জন্য। কারণ, তার সঙ্গেই বাসায় ফিরতাম আমি। ফুপির জন্য অপেক্ষা করার সময়টা কাটাতে সালমানের বাসায় চলে যেতাম।’

‘কখনো কখনো সালমান বাসায় গিয়ে পোশাক বদলে আবারও স্কুলে চলে আসত। স্কুল মাঠে আমরা দুজনে খেলতাম। আমরা কখনো কখনো ছবি আঁকতাম। একসময় সালমান পরিবারের সঙ্গে খুলনা শহর ছেড়ে যায়। আমি খুলনাতেই থেকে যাই। পরে আবার আমিও ঢাকায় চলে আসি। তারপর অনেক বছর যোগাযোগ ছিল না ওর সঙ্গে।’

‘আমি পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, সালমানও। কলেজ জীবনে মোহাম্মদপুরে কোচিং করতাম। সালমান সেখানে মাঝে মাঝে আসত। আমার এক বন্ধুর বন্ধু ছিল সে। দূর থেকে দেখতাম, কিন্তু কথা হত না। অনেক বছর দেখা না হওয়ায় একটা জড়তা কাজ করত।’

‘কলেজ জীবনে আমি মডেলিং শুরু করি। মডেলিং করতে গিয়ে হঠাৎ সিনেমায় অফার পেয়ে যাই। চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান আমাকে ডাকেন একদিন। সেখানে ডাকা হয় সালমানকেও। অবশ্য আরও কয়েকজন সেদিন এসেছিলেন নায়ক হওয়ার জন্য সোহানুর রহমান সোহান ভাইয়ের কাছে ইন্টারভিউ দিতে।’

‘এক ফাঁকে সোহান ভাই আমাকে বলেছিলেন, ইমন নামের একজন আসবে। ছেলেটি টেলিভিশনে নাটক করেছে কয়েকটি। একটু পর পর একজন করে আসছে, আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি। কিন্তু কাউকে ইমন ওরফে সালমানের মতো লাগছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম- ও কী তাহলে আসবে না? বেশ পরে সিঁড়ি দিয়ে একজন ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকে। গ্লাস দিয়ে একটু দেখতে পাই। আমি মনে মনে ভাবি, ওই তো ইমন? ইমনের মতোই তো লাগছে?’

‘পরিচালক আমাকে ডাকেন। সালমান সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি যাই, মুখোমুখি হই দুজনে। সালমান বলে, তুমি কী আরিফা? আমি বলি, তুমি কী ইমন? পরিচালক জানতে চান, তোমরা কী দুজন দুজনকে চেনো? আমরা দুজনেই বলি, ছোটবেলায় আমরা একই স্কুলে পড়েছি।’

‘পরিচালক অবশেষে সালমানকে চূড়ান্ত করেন নায়ক হিসেবে। শুরু হলো “কেয়ামত থেকে কেয়ামত” সিনেমার শুটিং। সালমান ছিল জীবনের সেরা বন্ধু। প্রিয় বন্ধুটি নেই অনেক বছর। তাকে খুব মিস করি।’

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমার শুটিংয়ের অবসরে অনেক গল্প করতাম আমরা। গল্পজুড়ে সিনেমার কথা থাকত না। গল্প করতাম ফেলে আসা ছেলেবেলা নিয়ে। একদিন শুটিংয়ের ফাঁকে গল্প করছি, গল্প আর শেষ হচ্ছে না। পরিচালক একটু রাগ করলেন। বললেন, কত গল্প করো তোমরা? আমরা কোনো প্রতিবাদ করতাম না। শুধু হাসতাম।’

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমাটি মুক্তির পর অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেল। দর্শকরা সিনেমাটি লুফে নিলো, ব্যবসা সফল হলো। আমরা তো কল্পনাও করিনি সিনেমাটি এতো ব্যবসা করবে, এতো দর্শক সাড়া পাবে। একটা সিনেমা দিয়েই সালমান ও আমার পরিচিতি তৈরি হয়ে গেল। ঢাকার সিনেমা নতুন জুটি পেল। চলচ্চিত্র শিল্প নড়েচড়ে বসল সিনেমাটি হিট হওয়ার পর। আমাদের নিয়ে ভাবতে লাগলেন অন্য পরিচালকরা। সিনেমাটি হিট হওয়ার পর সালমান ও আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।’

‘ওই সময় প্রায়ই বাসার ফোনে সালমান কল করত। কখনো আমিও করতাম। সালমান ফোন করলে কথা শেষ হতো না। দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলার অভ্যাস ছিল ওর।’

‘আমাদের জুটি নিয়ে আরও সিনেমা হতে থাকলো। কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমার পর ওর সঙ্গে জুটি হয়ে সবচেয়ে আলোচিত ছিল অন্তরে অন্তরে সিনেমাটি। এটা আমার মতামত। অন্তরে অন্তরে সিনেমাটি বছরব্যাপী সিনেমা হলে চলেছিল। যেমনটি চলেছিল কেয়ামত থেকে কেয়ামত। পর পর কয়েকটি সিনেমা করার পর আমরা জুটি হিসেবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলি।’

‘অন্য নায়কদের সঙ্গেও সিনেমা শুরু করি আমি। সালমানও অন্য নায়িকাদের সঙ্গে সিনেমা করতে থাকে। অনেক ব্যস্ততার পরও সালমান বাসার ফোনে কথা বলত শুটিং থেকে ফিরে, আমার খোঁজ নিত, বাসার সবার খোঁজ নিত। ওর কথায় কখনোই মনে হতো না অনেক বড় তারকা হয়ে গেছে। সুপারস্টার হওয়ার পরও আমাদের বন্ধুত্বে কোনো ঘাটতি ছিল না। ওর চোখেও সেরা বন্ধু ছিলাম আমি। আমার চোখেও সেরা বন্ধু সালমান।’

‘প্রচণ্ড ব্যস্ততার দিনগুলোতে সালমান ও আমি অন্য নায়ক নায়িকাদের সঙ্গে কাজ করেছি। এমনও হয়েছে এফডিসিতে একটি ফ্লোরে সালমান শুটিং করছে, আমি অন্য ফ্লোরে। রাতভর দুজনের শুটিং চলত দুই ফ্লোরে। সেই ফাঁকে সালমান একটু সময় বের করে দেখা করতে আসত। বন্ধুত্বের টান ছিল এমনই।’

‘মনে পড়ে, একটি সিনেমায় সালমানের শিডিউলের কারণে কাজ শেষ করা যাচ্ছিল না। একদিন এফডিসিতে গিয়ে তাকে বলেছিলাম, সালমান সময় বের করে শিডিউল দিও। পরে ঠিকই শিডিউল দিয়েছিল।’

‘সালমানকে নিয়ে গল্প শেষ হবে না। অসম্ভব রকমের স্টাইলিশ নায়ক ছিল সালমান। সেই সময়ে ওর মতো স্টাইলিশ নায়ক আর একজনও ছিল না। অনেকে মনে করতেন, সালমানের সঙ্গে বুঝি আমার প্রেমে ছিল। না, মোটেও তেমন কিছু না। সালমান ছিল আমার ভালো বন্ধু। গভীর বন্ধুত্ব ছিল আমাদের দুজনের।’

‘প্রিয় বন্ধুর প্রয়াণ দিবসে কেবলই আশীর্বাদ। সালমান ছাড়া দুই যুগ কেটে গেল! মনেই হয় না এতোগুলো বছর সালমানকে ছাড়া আমরা কাটিয়ে দিলাম। সালমান, যেখানে আছো ভালো থেকো।’

আরও পড়ুন