শনিবার, ০২ Jul ২০২২, ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন

রামপুরা টিভি ভবনের সামনে রিকশার জটলা। এর মধ্যে একটি রিকশা দূর থেকেই নজর কাড়ে। রিকশাটির সামনে বেশ কয়েকটি সার্জিক্যাল মাস্ক ঝোলানো। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আরেকজন রিকশাওয়ালা জানতে চাইলেন, ‘একখান মাস্ক কয় টেকা?’

‘এগুলা যাত্রীগো জন্যি। ফিরি (ফ্রি)। বেচুম ক্যা।’ এরই মধ্যে মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক এসে বললেন, ‘এই খালি যাইবা, মালিবাগ।’

‘আপনের মুখে তো মাস্ক নাই।’ বলেই রিকশার সিট ওল্টালেন। সেখান থেকে এক প্যাকেট মাস্ক বের করে যাত্রীর দিকে এগিয়ে দিলেন—‘একটা লন। মুখে লাগান। টেকা লাগব না।’ রিকশাওয়ালার এমন প্রস্তাবে কিছুটা ধাক্কা খেলেন সেই ভদ্রলোক। সেটা সামলে পরে হাসিমুখেই বললেন, ‘বাহ্, তোমার সিস্টাম তো ভালা।’

যাত্রীদের বিনা পয়সায় মাস্ক সরবরাহকারী এই চালকের নাম সাদেক আলী সরদার। থাকেন রামপুরায়, একটি গ্যারেজে। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই মানুষটির আয় সামান্য। কিন্তু মানুষের জন্য দরদ অনেক। দিনভর রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন তার একটি অংশ ব্যয় করেন যাত্রীদের জন্য মাস্ক কেনায়। প্রথম দিকে মাস্ক কিনে রিকশায় ঝুলিয়ে রাখতেন। এখন রাখেন রিকশার সিটের নিচে। মাস্কবিহীন যাত্রী তোলেন না। যাত্রী ছাড়াও পথচারীদেরও মাস্ক দেন। করোনাবিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তাও প্রচার করেন। তাঁর রিকশার সামনে বড় হরফে লেখা, ‘মাস্ক পরুন, সুস্থ থাকুন। সাবান দিয়ে প্রতি আধাঘণ্টা পর পর হাত-মুখ ধুয়ে ফেলুন। জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা নিয়ে ঘর থেকে বাহির হবেন না। মাস্ক ছাড়া রিকশায় উঠবেন না।’

বেশি দূর পড়তে পারেননি
সাদেকের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার বৈদ্যপুরে। সাত ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। প্রাথমিকের

গণ্ডি পেরোতে পারেননি। কিশোর বয়সেই নৌকার বৈঠা ধরতে হয়েছিল। আত্রাই নদীতে পণ্য পারাপার করতেন। এক পর্যায়ে ভ্যান চালানো শুরু করলেন। এরপর কয়েক মাস রিকশা চালিয়েছেন রাজশাহীতে।

এক গ্যারেজে ১৫ বছর
২০০১ সাল। একদিন এক প্রতিবেশীর সঙ্গে এলেন মেরুল বাড্ডার আনন্দনগরে। এক রিকশা গ্যারেজে গেলেন। কিন্তু মালিক সাদেক সরদারকে বিশ্বাস করতে চাননি। অন্য রিকশাচালকরাও বলেছিলেন, রিস্ক নিয়েন না। পরে কাকুতি-মিনতি করে সাদেক বললেন, ‘চাচা, গ্যারেজের একেবারে পুরানা রিকশাটা আমারে চালাইবার দেন।’ এই কথায় মন গলল মালিকের। পরে সাদেকের ব্যবহারে খুব খুশি হয়েছিলেন সেই গ্যারেজের মালিক। ফলাফল—এক গ্যারেজেই টানা ১৫ বছর।

ভাগ্য ফিরল না
একসময় দেখলেন শরীর আর আগের মতো সায় দিচ্ছে না। পরে নওগাঁয় ফিরে গেলেন। ধারদেনা করে একটি অটোরিকশা কিনলেন। ভেবেছিলেন পেডাল চাপার কষ্ট বুঝি এবার দূর হবে। কিন্তু বিধিবাম! অটোরিকশা কেনার কিছুদিন পরই জটিল অসুখে পড়লেন। এক পর্যায়ে চিকিৎসার খরচ জোগাতে রিকশাটি বিক্রি করতে হলো। অসুখ সারলে আবার ঢাকার পথ ধরলেন। বছর চারেক ধরে রামপুরার সীমা গ্যারেজই তাঁর ঠিকানা। এখান থেকে বেশির ভাগ দিনই চলে যান পুরান ঢাকায়। সারা দিন রিকশা চালিয়ে রাতে ফেরেন। লকডাউনের আগে দিনে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা রোজগার হতো। এখন আয় কমে গেছে। দৈনিক ১০০ টাকা দিতে হয় রিকশার ভাড়া। ভাত খরচ ১০০। সব মিলিয়ে দিনে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মতো খরচ হয়। বাকি টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সাদেক সরদার এখন তিন সন্তানের জনক। বড় ছেলে গেলবার এইচএসসি পাস করেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেজোটা নবম শ্রেণিতে পড়ে। রিকশা চালিয়েই পড়াশোনা করাচ্ছেন ছেলেদের।

বিনা পয়সায় মাস্ক
দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর সাদেক বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। কয়েক মাস পর ঢাকায় ফিরে দেখলেন, মাস্ক না পরলে পুলিশ ঝামেলা করে। মাস্কবিহীন অনেক যাত্রীকে জরিমানাও গুনতে হয়েছে। পরে তিনি মাস্ক পরা শুরু করলেন। কিন্তু রিকশায় আরোহীদের অনেকেই মাস্ক পরতেন না। মাস্ক পরার কথা বললে অনেক সময় যাত্রীর ঝাড়িও খেতে হয়। অনেকে বলেন, ভুলে মাস্ক নিয়ে বের হননি। ভাবলেন নিজেই মাস্ক কিনে যাত্রীদের দেবেন। জুন মাসের শেষের দিকের ঘটনা। এক দিন ৫০ টাকার সার্জিক্যাল মাস্ক কিনলেন। যাত্রীদের মধ্যে সেগুলো দিলেন। প্রথম দিন অনেকের সাধুবাদ পেয়ে সাদেকের উৎসাহ বাড়ল। এর পর থেকে প্রতিদিন মাস্ক কেনেন। বিতরণ করেন। ‘সামনে কেউরে পাইলে যখন দেখি মাস্ক পরছে না, তখন প্যাকেট আগায় দিই। বলি, ভাই, মাস্ক পরেন। পুলিশে জরিমানা করতাছে। হোক আমার ৫০-৬০ টাকা খরচ।’ হাসিমুখে বলছিলেন সাদেক। এখন দিনে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকার মাস্ক কেনেন।

দিনভর সেগুলো যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে বিতরণ করেন। ‘কাইলকা ১০০ টাকার কিনছিলাম তাঁতীবাজার থাকি। গোটা দিন ১৮০ টাকার বেশি ভাড়া মারতে পারি নাই। পরে গাড়ির জমা দিতে পারি নাই। মালিকরে কইছি, ভাই, ভাড়া বেশি পাই নাই। আইজকা জমা দিমু না। মালিক কইল, ঠিক আছে।’ তবে সবাই যে সাদেকের এই কাজ ভালো চোখে দেখে তা নয়। অনেকে তাঁকে ‘পাগল’ও বলে। কিন্তু সাদেক সেসব থোড়াই কেয়ার করেন। সাদেক বললেন, ‘একদিন একজনে কইল, কত পাগলা যে আছে ঢাকা শহরে। মাইনসে পাগল কয়, ছাগল কয়, তার ছিঁড়া কয়। যা-ই কউক; আমার ভালা লাগিছে, নিজের টেকা দিয়া কিনতাছি, মাইনসেরে দিতাছি। অন্যের কথা শুনবার যামু কা।’ এভাবে কত দিন মাস্ক দিয়ে যাবেন? সাদেক বললেন, ‘যেদ্দিন করোনা আছে, চেষ্টা করুম সেদ্দিন চালাতে।’

সাদেকের রিকশা গ্যারেজের মালিক মিলন দেওয়ান বললেন, ‘ও খুব সহজ-সরল মানুষ। মাস্ক দেয় দেখে প্রথম প্রথম আমরা হাসাহাসি করতাম। এখন মনে হয় সাদেক ঠিক কাজটাই করতাছে।’ – কালের কন্ঠ

আরও পড়ুন