সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০১:১৩ পূর্বাহ্ন

মধ্যরাত। একটি সরু গলিতে কয়েক শ মানুষের ভিড়। ছেলে-বুড়ো-নারী সবাই আছেন সেখানে। দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে কেউ রাস্তায় ইট পেতে বসেছেন। কেউ আবার বাসা থেকে নিয়ে এসেছেন চেয়ার। জটলায় সময় কাটাতে গল্পে মেতেছেন নারীরা। চোখে যাতে ঘুম না আসে তাই ছেলেরা লুডু খেলার আসর জমিয়ে তুলেছেন। আবার বড় সাইজের মোবাইল ফোন দেয়ালে দড়ি দিয়ে টানিয়ে তাতে সিনেমা চালানো হয়েছে। জমে উঠেছে চায়ের দোকানগুলো। দু-একটি দোকান সারা রাত খোলাও ছিল। বয়স্ক অনেকেই চেয়ারের নিচে কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। মানুষের এমন জটলা, দীর্ঘ সারি আর রাতভর অপেক্ষা শুধু করোনাভাইরাসের টিকা পাওয়ার আশায়।

রাজধানীর হাজারীবাগের কালুনগর এলাকার গণটিকাদান (নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র-১) কেন্দ্রকে ঘিরে ছিল এই ভিড়। যদিও টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ৯টায়। কিন্তু আগের দুই দিনের অভিজ্ঞতা থেকেই লোকজনের এই সতর্কতা ও প্রস্তুতি। এর আগে তাঁদের কেউ কেউ সকালে এসে টিকা নিতে পারেননি। এমনকি ভোরে এসেও না। তাই আগের দিন সন্ধ্যার পর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হতে থাকে মানুষের সারি। তবুও সকালে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। রাতের সারি কিছুটা ভেঙে গেল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকে আগে টিকা পাওয়ার চেষ্টা করায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তাই সারা রাত লাইনে দাঁড়িয়েও টিকা না নিয়ে অনেককে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

ওই দুর্ভাগাদের একজন শিরিন। গতকাল মঙ্গলবারের টিকার জন্য সোমবার রাত ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ভোর পর্যন্ত লাইন ঠিক থাকলেও সকালে এলোমেলো হয়ে যায়। হট্টগোলে পেছনে পড়ে যান শিরিন। তাই তাঁর আর টিকা পাওয়া হলো না। তিনি বলেন, ‘মশার কামড় খাইয়া কষ্ট সইয়া খারাইয়া আছিলাম। কিন্তু ভ্যাকসিন লইতারি নাই’।

তবে ১৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করে টিকার দেখা মিলেছে জাহানারা বেগমের। তিনি এই কালুনগরেই থাকেন। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় টিকা নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাহানারা। গতকাল সকাল ১০টায় টিকা নিতে পেরেছেন তিনি।

গতকাল সকাল থেকে লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীর চর ও শহিদনগরসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন করোনাভাইরাসের গণটিকাদানকেন্দ্রগুলো সরেজমিনে ঘুরে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা দেখা যায়। অনেক কেন্দ্রের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, এই অব্যবস্থাপনার জন্য তাঁদের খুব একটা দায় নেই। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একটি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক বলেন, ‘এত মানুষকে এক দিনে সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের বেশির ভাগেরই নেই। প্রতিদিন যেখানে ২০-৫০ জনকে সেবা দিয়ে অভ্যস্ত সেখানে হুট করে হাজার-বারো শ মানুষ এসে হাজির হচ্ছেন। অথচ আমাদের জনবল বাড়ানো হয়নি।’

লালবাগের শেখ সাহেব বাজার এলাকায় অবস্থিত সূর্যের হাসি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘৩০০ টিকা আমরা বরাদ্দ পাচ্ছি। কিন্তু এই ৩০০ টিকা দেওয়ার পাশাপাশি আবার নিবন্ধনও করতে হবে। এত চাপ অল্প জনবল নিয়ে করা সম্ভব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। ফলে ৩০০ টিকার সবই আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে না। ২০০ টিকার কিছুটা বেশি দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি।’

লালবাগের গণটিকাদানের আরেকটি কেন্দ্র হাজী আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে কয়েক স্তরে টিকাপ্রত্যাশীদের অবস্থান দেখা যায়। মানুষের চাপ সামলাতে স্কুলের প্রধান ফটকে পুলিশের অবস্থানও রয়েছে। বারবার চেষ্টা করেও লোকজনকে সুশৃঙ্খলভাবে এক সারিতে রাখা যাচ্ছিল না। সবাই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। আবার কাটাবন এলাকায় একটি কেন্দ্রে মাইকিং করে মানুষকে সরাতে দেখা যায়।

হাজারীবাগের কালুনগর এলাকায় গণটিকাদানকেন্দ্রটিতে সোমবার সন্ধ্যা থেকেই পরের দিনের টিকার জন্য লাইন পড়েছিল। আর গতকাল বিকেল ৫টা থেকেই দেখা গেছে, লোকজন লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেছে আজ বুধবারের টিকার জন্য।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২টি ওয়ার্ডের টিকাকেন্দ্রে সুপারভাইজারের দায়িত্ব পালন করছেন মো. আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মানুষের চাপ সামলানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিছু বললে অনেকে মারমুখী হয়ে ওঠে।’

আরও পড়ুন