সোমবার, ০৪ Jul ২০২২, ০৮:৩১ অপরাহ্ন

প্রায় চার বছর ধরে বাসচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করছেন ভাবনা আক্তার। বেসরকারিভাবে দেশে নারী যাত্রীদের জন্য চালু হওয়া দোলনচাঁপা বাসে যাঁরা চড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই চেনেন ভাবনাকে। সম্প্রতি এক দুপুরে দোলনচাঁপা বাসে বসেই কথা হয় ভাবনা আক্তারের সঙ্গে। কাজের ফাঁকে তিনি জানান তাঁর জীবনের গল্প।নারী হিসেবে বাসচালকের সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ভাবনা বলেন,‘রাস্তায় বাসের গেটে দেখলে অনেকে হাসে নারী হেলপার বলে। তবে বাসের হেল্পারি করি, খারাপ কাজ তো করি না।

স্বামী বা পরিবার থেকেও কোনো বাধা আসেনি কখনো।’২০১৮ সালের জুন মাসে মিরপুর ১২ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দোলনচাঁপা বাস সার্ভিস চালু হয়। বাংলাদেশের র‌্যাংগস গ্রুপ ও ভারতীয় ভলভো আইশার ভেহিকেল লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ৩৬ আসনবিশিষ্ট সার্ভিসটি চালু হয়।দুপুরের দিকে বাসে যাত্রী ছিলেন মাত্র কয়েকজন। যাত্রীদের স্টপেজ আসার আগেই চালককে গাড়ি থামানোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন ভাবনা। বাস থেকে নারী যাত্রীদের নামতে বা উঠতে সাহায্যও করছিলেন।ভাবনার হাতের মুঠোয় ১০০ টাকার নোটসহ বেশ কিছু টাকা। সুন্দর করে হেসে ভাড়া চাচ্ছিলেন যাত্রীদের কাছে। তিনি জানান, মিরপুর ১২ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৩০ টাকা ভাড়া। এর মধ্যে যে যাত্রী যে স্টপেজ থেকে ওঠেন, সে অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

হলুদ জামার সঙ্গে লাল ওড়না আর পায়জামা পরা ভাবনা গলা চড়িয়ে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার বলে যাত্রীদের সতর্ক করে দিচ্ছিলেন। মাথায় ওড়না, মুখে মাস্ক আর সাজগোজ বলতে দুই হাতে প্রায় রং জ্বলে যাওয়া চিকন দুটি চুড়ি। হাতের আঙুলে পিতলের একটি আংটি। দীর্ঘদিনের পরিচিত যাত্রীদের অনেকেই ভাবনাকে নাম ধরে ডাকেন আবার অনেকে আপাও বলেন।অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন ভাবনা। এর আগে তিনি একটি দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তিনি জানান, মার্কেটে দোকানের কাজ তুলনামূলক সহজ ছিল, কিন্তু সময় দিতে হতো অনেক বেশি।

মার্কেট বন্ধ হলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হতো। এর ফলে সংসারের কাজ করতে পারতেন না। আর এখন কাজটা কঠিন, কষ্টের, তবে সম্মান আছে। সময়ও পাওয়া যায় অনেক। শুক্র ও শনিবার দুই দিন ছুটির পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন দিবসের ছুটিও পাওয়া যায়। সকালে ডিউটি থাকলে বেলা দুইটার মধ্যে আর বিকেলে ডিউটি থাকলে রাত আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারেন। অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকলেও বেতন কাটার ভয় নেই।

বর্তমানে বেতন পান ১০ হাজার ৫০০ টাকা। করোনার শুরু থেকে দীর্ঘদিন বাস সার্ভিস বন্ধ থাকলেও ভাবনা মাসের বেতন মাসেই পেয়েছেন, বেতন নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি।এক সপ্তাহ সকালে এবং এক সপ্তাহ বিকেলে ডিউটি করেন ভাবনা আক্তার। রাজধানীর খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকেন। ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে গ্রামে শাশুড়ির কাছে থাকে। ভাবনা জানান, স্বামী মো. জাহেদুল ইসলাম দিনমজুরের কাজ করেন। কাজ করলে পান ৪৫০ টাকা, আর কাজ না থাকলে কোনো টাকা পান না।

দুজন দুজনকে পছন্দ করেছিলেন, পরে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাঁদের। বিয়ের বয়স গড়িয়েছে ১১ বছর।কাজ নিয়ে স্বামী আপত্তি করেন কি না, জানতে চাইলে ভাবনা বলেন, ‘স্বামী কাজ নিয়ে কোনো আপত্তি করে না। মাসের বেতন খরচ করার বিষয়েও কিছু বলে না। গরিব মানুষ, দুজনের টাকা মিলেই সংসার চালাইতে হয়। তাই চালাই।’বেতনের টাকা কীভাবে খরচ করেন জানতে চাইলে ভাবনা হেসে উত্তর দিলেন, ‘গরিবের সংসারে টাকা কোন দিয়া খরচ হইয়া যায়।’ ভাবনা এ পর্যন্ত নিজের জন্য একটি সোনার চেইন বানিয়েছেন। ঘরের টুকটাক জিনিস কিনেছেন। এ ছাড়া স্বামীর রোজগারের টাকার ঠিকঠিকানা নেই তাই বেতন পেয়েই বাসা ভাড়ার ছয় হাজার টাকা আর বাড়িতে মেয়ের জন্য আড়াই হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন ভাবনা। তারপর যা থাকে,

তা দিয়ে নিজেদের খাওয়াদাওয়া ও অন্যান্য খরচ তো আছেই।কাজের একটা পর্যায়ে বাসে চালক আর ভাবনা ছাড়া কেউই থাকেন না। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এ আশঙ্কা কাজ করে কি না, প্রশ্নের উত্তরে ভাবনা বলেন, বাসে চারটি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে। আর তিনি ছাড়াও অন্য নারী হেলপারদের সঙ্গে চালকদের ভাই-বোনের মতো সম্পর্ক। তাই এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। আর ঘটলেও কোম্পানি নিশ্চয়ই তার দায় নেবে।

খিলক্ষেত থেকে সকালে ডিউটি থাকলে মিরপুর ১২ নম্বর, বিকেলে ডিউটি থাকলে মতিঝিলে এবং বাড়ি ফেরার সময়ও ভাবনা বাসেই যাতায়াত করেন। অন্য বাসে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে ভাবনা বলেন,‘নারী-পুরুষে ধাক্কাধাক্কি, পুরুষ হেলপারের খারাপ ব্যবহার—এগুলো সব নারীকেই সহ্য করতে হয়।’নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে ভাবনা বলেন, এখানে সকাল ও বিকেলে অফিস সময়ে নারী যাত্রীর সংখ্যা বাড়ে। নারীর সঙ্গে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেসন্তান বাসে যাতায়াত করতে পারে। এ ছাড়া নারী যাত্রীর কোনো প্রতিবন্ধী ছেলেসন্তান থাকলে বিশেষ বিবেচনা করা হয়। তবে কোনোভাবেই নারীর সঙ্গে থাকা পুরুষ স্বজন বাসে চড়তে পারেন না।

নারীদের বাসে ধাক্কাধাক্কি লাগলেও নারীর সঙ্গেই লাগে, কোনো পুরুষের সঙ্গে লাগে না, তাই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না। নারী যাত্রীরা এ ধরনের বাসের সংখ্যা বাড়াতে বলেন। অনেক সময় নারী যাত্রীরা দোলনচাঁপা বাসের দেখা পান না, এ অভিযোগ প্রসঙ্গে ২৮ বছর বয়সী ভাবনা জানান, অফিসের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাস চলাচল করে। নির্দিষ্ট স্টপেজ ও সময় আছে। তাই সেই সময়মতো না এলে তো দেখা পাওয়া যাবে না। র‌্যাংগস গ্রুপের দোলনচাঁপার কো-অর্ডিনেটর ফারিয়া রাসুল প্রথম আলোকে বলেন, দোলনচাঁপা সার্ভিসটি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে শুরু করা হয়েছে। এটি কখনই তেমন লাভজনক ব্যবসা ছিল না বা গ্রুপের পক্ষ থেকে লাভজনক না হলে তা চালানো হবে না, তেমন চিন্তাও করা হয়নি।

করোনায় যাত্রী না থাকায় চারটি বাসের মধ্যে দুটি বাসের সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে নারী হেলপারের সংখ্যা আটজন থেকে চারজনে নেমে আসে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাস আবার চালু হবে, হেলপাররাও কাজে ফিরবেন। বর্তমানে দুটি বাস মিরপুর ১২, মিরপুর ১১, মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত চারটি ট্রিপ দিচ্ছে।

একেকটি বাসে দুই শিফটে দুজন করে নারী হেলপার কাজ করছেন। এই নারীরাও বেতনসহ ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাচ্ছেন। ফারিয়া রাসুল আরও জানান, নারী যাত্রীদের জন্য দোলনচাঁপা অ্যাপ আছে। প্লে স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে যাত্রীরা বাসটি কত দূরত্বে আছে বা অন্য সব তথ্য জানতে পারছেন। আর বাসে চালক, যাত্রী বা অন্য কোনো ঝামেলা হচ্ছে কি না, তা র‌্যাংগস ভবনে বসেই মনিটর করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন