বৃহস্পতিবার, ১১ অগাস্ট ২০২২, ০৬:১৭ অপরাহ্ন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরকারকে লোড-শেডিং দিতে হচ্ছে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেছেন তিনি। সেইসঙ্গে কোন এলাকায় কত সময় লোডশেডিং দেওয়া হবে তার একটি রুটিন তৈরি করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। কিন্তু এখন আমাদের লোড-শেডিং দিতে হবে এবং বিদ্যুতের উৎপাদন সীমিত করতে হবে। কারণ, আমাদের বিদ্যুতের ভর্তুকির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে।’

বুধবার (৬ জুলাই) চুয়েট ক্যাম্পাসে এক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চুয়েট শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর’ নামে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসভিত্তিক আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ জামাল ডরমিটরি এবং রোজী জামাল ডরমিটরি-ও উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক লোড-শেডিংয়ের জন্য একটি রুটিন তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘কোন এলাকায় কত সময় লোড-শেডিং দেওয়া হবে তার একটি রুটিন তৈরি করুন। কারণ, জনগণ যেন সেজন্য প্রস্তুত হতে পারে এবং তাদের দুর্ভোগ কমানো যায়।’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেল, এলএনজি, ডিজেলসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে এবং আমেরিকা ও ইউরোপের রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটছে তা উপলব্ধি করে দেশবাসী সরকারকে এ লক্ষে সহায়তা করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। সরকার বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে মোট ২৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখার জন্য গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানিতে আমাদেরকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।’

বর্তমান বাজেটে ৮৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভর্তুকি না কমালে সরকার টাকা কোথা থেকে পাবে?’ তিনি বলেন, ‘ভর্তুকি ছাড়াও তার সরকার দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য প্রণোদণা প্যাকেজ দিয়েছে, ভর্তুকি মূল্যে প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে এক কোটি রেশন কার্ড দিয়েছে এবং বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিচ্ছে, যা অনেক ধনী দেশও করেনি।’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার ওপর আমেরিকা ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে এবং সরকারকে কী পরিমাণ ভর্তুকি বাড়াতে হয়েছে তারও একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যে ফার্নেস অয়েলের মূল্য ছিল মাত্র ৭০৮ টাকা, সেটা ইউক্রেন যুদ্ধের পর হয়ে গেছে ১ হাজার ৮০ টাকা। অর্থাৎ ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এলএনজি যেটা মাত্র ১০ মার্কিন ডলারে ক্রয় করা হতো, যুদ্ধের ফলে সেটা এখন ৩৮ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ২৮০ শতাংশ দাম বেড়ে গেছে।

আমাদের কয়লাও ১৮৭ মার্কিন ডলার ছিল, এখন ২৭৮ মার্কিন ডলার। বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ। ডিজেলে ছিল ৮০ মার্কিন ডলার ছিল তা এখন ১৩০-এ চলে এসেছে। শোনা যাচ্ছে ৩০০ ডলার পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। ভোজ্য তেলেরও দাম বাড়ছে। প্রত্যেকটি জিনিস যেগুলো কিনে আনতে হয়, তার দাম অত্যাধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রতি কিউবিক মিটার এলএনজি ক্রয়ে সরকারের ব্যয় ৫৯ দশমিক ৬০ টাকা। কিন্তু আমরা সেটা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছিলাম মাত্র ৯ দশমিক ৬৯ টাকায়। যেটা সম্প্রতি ১১ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। তারপরও বিশাল অংকের ভর্তুকি রয়ে গেছে সেখানে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতি ইউনিটে উৎপাদন ব্যয় ১২ দশমিক ৮৪ টাকা কিলোওয়াট ঘণ্টা, কিন্তু একক প্রতি পাইকারি মূল্যে আমরা দিচ্ছি ৫ দশমিক ০৮ টাকায়।

ফার্নেস ওয়েলের প্রতি একক ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় হচ্ছে ১৭ দশমিক ৪১ টাকা, সেটাও আমরা ৫ দশমিক ০৮ টাকায় দিচ্ছি। ডিজেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৩৬ দশমিক ৮৫ টাকা সেখানেও আমরা ৫ দশমিক ০৮ টাকা দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করছি। কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ১২ দশমিক ৩৭ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৫ দশমিক ০৮ টাকায়। অর্থাৎ সারা বিশ্ব এখন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।’’

আরও পড়ুন