সোমবার, ০৪ Jul ২০২২, ০৭:০৯ অপরাহ্ন

আমি একজন ব্যর্থ সন্তান। আমি আমার বাবা-মা-ভাই ও স্বজনদের কবরগুলোও রক্ষা করতে পারিনি। আমি ব্যর্থ বলেই শ্মশানের ম’রদেহ পোড়া মাটি দিয়ে আমার বাবা-মায়ের কবর ভরা হয়েছে- কথাগুলো বলতে বলতে ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করেন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান এমপি।

চারদিকে তখন পিনপতন নীরবতা আর শামীম ওসমান দোয়ায় দু’হাত তুলে ক্ষমা চাইছিলেন তার পরিবারের মৃ’ত স্বজনদের কবরের সামনে। কবরস্থানে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি তার ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন।

সোমবার দুপুরে শহরের মাসদাইর এলাকায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কেন্দ্রীয় কবরস্থানে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় শ্মশানের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লাশ পোড়ানো ছাই ফেলা পুকুরের মাটি দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের মৃত সদস্যদের কবরসহ আশপাশে থাকা বহু মুক্তিযোদ্ধার কবরও।

সোমবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, ওসমান পরিবারের কবর ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থ করার জন্য সংরক্ষিত অংশের কবরগুলোর উপর শ্মশানের পুকুর কেটে তোলা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধার কবরের সাইনবোর্ড, বেষ্টনী পর্যন্ত তুলে ফেলা হয়েছে।

শ্মশানের মাটি কবরস্থানে রেখে রীতিমতো টিলা বানিয়ে রাখা হয়েছে। শ্মশানের পুকুর কেটে মাটি দেওয়ায় শামীম ওসমানের দাদা খান সাহেব এম ওসমান আলী, দাদি জামিলা ওসমান, বাবা ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আবুল খায়ের মোহাম্মদ (একেএম) সামসুজ্জোহা, মা ভাষাসৈনিক নাগিনা জোহা ও বড়ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম নাসিম ওসমানের কবর প্রায় নিশ্চিহ্নের কাছাকাছি।

পাশেই একাধিক মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেক সাধারণ কবরের অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে এই লাশ পোড়ানো ছাই আর পোড়ামাটিতে চাপা পড়ে।

বিষয়টি নিয়ে চরমভাবে মর্মাহত শামীম ওসমান এমপি জানান, গত ২৭ জুলাই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রয়াত মা মমতাজ বগমের কবর জিয়ারত করে কবরস্থানে স্বাভাবিক অবস্থা দেখে গেছি। অথচ এরই মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগকৃত ঠিকাদার মামুন মিয়া কবরস্থানের পাশে শ্মশানের পুকুর খননসহ সংস্কার কাজ করতে গিয়ে তার পরিবারের চার সদস্য ও বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্তত অর্ধ শতাধিক কবর ভরাট করে ফেলেছে।

কবরস্থানের পশ্চিম দিকে বেশ কিছু পরিমাণ জায়গায় ওই মাটি ফেলে ভরাট করায় কবরগুলো মাটির সমতল হয়ে মিশে গেছে। ফলে কবরগুলো কয়েক ফুট নিচে দেবে গেছে। পাশাপাশি শ্মশানের মাটি কবরগুলোর উপরে ফেলাসহ দেশের বীরসন্তান বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কবরের সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা হয়েছে।

শামীম ওসমান বলেন, এই অমানুষিক কাজটি যারা করেছে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননাসহ ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত করেছে। এ ঘটনার মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে।

শামীম ওসমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সন্তান হিসেবে আমি ব্যর্থ যে আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য হয়েও বাবা-মায়ের কবরের পবিত্রতা হেফাজত করতে পারিনি। সেই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরগুলোকে অবমাননার হাত থেকে রক্ষা করতে পারিনি। আপনারা কি সহ্য করবেন যে, আপনাদের মা-বাবার কবরে শ্মশানের মরদেহ পোড়া মাটি দিয়ে কেউ ঢেকে দিলে। ওই সময় শামীম ওসমান বারবার বলতে থাকেন আমি আমার বাবার ব্যর্থ সন্তান। নাহলে এ দৃশ্য আমার দেখতে হতো না।

তিনি এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে কবরগুলো পূর্বের অবস্থায় ফিরিতে আনতে সেখানে দায়িত্বরতদের ৪৮ ঘণ্টা সময় দেন। এ সময় শামীম ওসমান উপস্থিত সাধারণ মানুষের প্রতি জানতে চান, একইভাবে তাদের পরিবারের প্রয়াতদের কবরে যদি শ্মশানের পোড়ামাটি দেওয়া হয় তাহলে সেটা তারা মানবেন কিনা? উত্তরে সবাই ‘না’ জানিয়ে কাজটি সঠিক হয়নি বলেন।

এদিকে এ ঘটনায় শ্মশানের পুকুর সংস্কার কাজের ঠিকাদার মামুন মিয়া ও কবরস্থান মসজিদের পেশ ইমাম বদর শাহ ও মুয়াজ্জিন মো. জাকারিয়ার কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।

শ্মশানের পুকুর সংস্কার কাজের ঠিকাদার মামুন মিয়া বলেন, তিনি পুকুরের মাটি কেটে তোলার পর কবরস্থান মসজিদের ইমাম বদর শাহ ও মসজিদ কমিটির সদস্য মো. শামসু আমার কাছ থেকে কবরস্থানের জন্য মাটি চান। আমি তাদের কথামতো মাটিগুলো কবরস্থানের মেইন গেটের বাইরে রাখি। পরে কবরস্থান মসজিদের ইমাম ও কমিটির লোকজন শ্রমিক দিয়ে মাটিগুলো কবরস্থানের ভেতরে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবরস্থান মসজিদের ইমাম বদর শাহ বলেন, কবরস্থানে শ্মশানের মাটি দেওয়া সমীচীন নয়। এখানে শুধু ধর্মীয় বিষয়ই না, এটা মানবিক দিক থেকেই উচিত নয়। নাপাক মাটি কবরে দেয়া উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কিন্তু ঠিকাদার মামুন মিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী কবরস্থানের জন্য আপনিই মাটি চেয়েছেন জানিয়ে বক্তব্য চাইলে ইমাম বদর শাহ এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

অপরদিকে মসজিদের মুয়াজ্জিন ও কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্বে থাকা মো. জাকারিয়া বলেন, এটা শ্মশানের মাটি। ঠিকাদাররা শ্মশান ও কবরস্থানের উন্নয়ন কাজ করছেন। যেহেতু কবরস্থান ও শ্মশানের দেখভাল করে সিটি করপোরেশন তাই আমরা বাধা দেইনি। তবে শ্মশানের লাশ পোড়ামাটি কবরের উপর দেওয়া উচিত হয়নি বলে তিনিও দাবি করেন।

স্থানীয় লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর হিসেবে নারায়ণগঞ্জের সুখ্যাতি বেশ পুরনো। আর এ সুখ্যাতির অন্যতম কারণ নগরের মাসদাইরে মুসলমানদের কবরস্থান, খ্রিস্টানদের কবরস্থান ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্মশান একই সাথে পাশাপাশি অবস্থিত। কিন্তু শ্মশানের লাশ পোড়া ছাই ও পোড়ামাটি কবরস্থানে রাখা বা ওই মাটি দিয়ে কবর ভরাট হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। – যুগান্তর

আরও পড়ুন