যুক্তরাষ্ট্রে হলো এমন এক ইতিহাস যা ৯৬ বছরেও দেখা যায়নি

যুক্তরাষ্ট্রে হলো এমন এক ইতিহাস যা ৯৬ বছরেও দেখা যায়নি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কানসাসে সিনেট আসনে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেভারেন্ড অ্যাডাম হ্যামিলটন। মঙ্গলবার তিনি রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়ে দিয়েছেন। আর তাতেই গড়া হয়ে গেছে ইতিহাস, এমন এক ইতিহাস যা ৯৬ বছরেও দেখা যায়নি। ১৯৩২ সালের পর কানসাসে এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট আসন জিতলেন। মহামন্দার সময়ের পর এমন ঘটনা আর ঘটেনি।
কানসাসে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সর্বশেষ জয় এনে দিয়েছিলেন জর্জ এস. ম্যাকগিল। ১৯৩২ সালে তিনি অল্প ব্যবধানে এক রিপাবলিকানকে হারান। তখন প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভারের মহামন্দা সামলানো নিয়ে গভীর অসন্তোষ ছিল। সেই অসন্তোষে ডেমোক্র্যাটরা সারা দেশে এগিয়ে যায় এবং ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট হোয়াইট হাউসে যান। ১৯৩৮ সালে ১২ পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে যান ম্যাকগিল।
২০২৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের জয় এনে দেওয়া হ্যামিলটন কানসাস সিটি এলাকার মধ্যপন্থী নেতা। তবে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি রিপাবলিকান দলের নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন। অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের হতাশা এবং মার্শালের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই চমকপ্রদ জয় পেয়েছেন। শেষ দিনগুলোতে মার্শাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে প্রচারে নেমেছিলেন। রিপাবলিকান পার্টি শেষ মুহূর্তে অর্থ সহায়তা দিয়েছিল। তবু তা যথেষ্ট হয়নি।
গত কয়েক বছরে কানসাস বাঁ দিকে সরছে, এমন ছোট ছোট ইঙ্গিত ছিল। রাজ্যটি দুই মেয়াদে একজন ডেমোক্র্যাট গভর্নর বেছে নিয়েছে। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে পাঠিয়েছে একজন সমকামী নেটিভ আমেরিকান ডেমোক্র্যাটকে। মার্শালের প্রতি অসন্তোষের লক্ষণও দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চেই। টাউন হল ধাঁচের এক সভায় ভোটাররা এত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে তাকে হঠাৎ সভা শেষ করে বেরিয়ে যেতে হয়।
তবু ২০২৪ সালে ট্রাম্প কানসাসে ১৬ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন। তাই শুরুতে এই লড়াই প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে বলে কেউ ভাবেননি। শরতের শুরুতে জনমত জরিপে দুই প্রার্থী সমানে সমান দেখা গেলে দুই দলই এই আসনে মনোযোগ বাড়ায়।
হ্যামিলটন চার্চ অব দ্য রিজারেকশনের প্রতিষ্ঠাতা। এই গির্জার সদস্য ২৪ হাজার। কানসাসের সবচেয়ে বড় গির্জা এটি। দেশের সবচেয়ে বড় ইউনাইটেড মেথডিস্ট জনগোষ্ঠীও এটি। তার নিজস্ব কিছু শক্তি ছিল। তিনি নিজেকে আত্মবিশ্বাসী মধ্যপন্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন। কয়েক দশক ধরে বড় জমায়েত সামলানোর অভিজ্ঞতা তার আছে। অর্থ সংগ্রহেও তিনি দক্ষ প্রমাণিত হয়েছেন। প্রচারে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগেই কানসাসের অনেক মানুষ তাকে চিনতেন। টিভিতে তার গির্জার প্রার্থনা সম্প্রচার হতো।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কথা ভাবার পর কানসাস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাকে প্রার্থী হতে রাজি করায়। হ্যামিলটন যুক্তি দেন, মার্শাল কানসাসের চেয়ে ট্রাম্পের পক্ষ নিচ্ছেন। রিপাবলিকান-ঘেঁষা এই কৃষিনির্ভর রাজ্যে তখন কৃষকদের সমস্যা জমছিল। ইরান যুদ্ধের কারণে ডিজেল, পেট্রল ও সারের দাম বেড়েছে। শুল্ক কমিয়ে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের আমদানির স্রোত এসেছে। অভিবাসন নিয়ে কড়াকড়িতে খামারে শ্রমিক কমেছে। এসব নিয়ে রাঞ্চারদের চাপ বেড়েছে।
ভোট এগিয়ে আসার সময় কানসাসে খরাও ছিল। এতে সয়াবিন, গম ও ভুট্টার ফলন কমেছে। কৃষকদের কষ্ট আরও বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, এ বছরের শরতে রাজ্যে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নিচে নেমে গেছে। অথচ টানা তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি কানসাসে দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিতেছিলেন।
হ্যামিলটনকে নবিস হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন মার্শাল। তার অভিযোগ ছিল, হ্যামিলটন দলীয় নেতাদের, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কের সিনেটর চাক শুমারের কাছে বাঁধা থাকবেন। হ্যামিলটন জবাবে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে জিতলে শুমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়ার চেষ্টার বিরোধিতা করবেন। নিজেকে তিনি সহযোগিতাপ্রবণ ও স্বাধীনচেতা আইনপ্রণেতা হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি রিপাবলিকানদের সঙ্গেও কাজ করতে স্বচ্ছন্দ। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অভিবাসন নীতিকে তিনি ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। জাতীয় ঋণ বেড়ে যাওয়ারও নিন্দা করেছেন।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনও পেয়েছেন হ্যামিলটন। কানসাসের দুই রিপাবলিকান সাবেক গভর্নর বিল গ্রেভস ও মাইক হেইডেন তাকে সমর্থন করেছেন। রিপাবলিকান প্রাইমারিতে এক-পঞ্চমাংশ ভোট পাওয়া মধ্যপন্থী রিপাবলিকান আর্চ নারামোর তার পক্ষে দাঁড়ান। তারই ফলাফল হ্যামলটনের এই জয়।
মন্তব্য ০
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।